শুক্রবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২১

Bangla Golpo || Jodi Jete Chao || Shahjahan

 


বাসের জানলার ধারে বসে একমনে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে ঐশী। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে, আর তার ছোটো ছোটো ছাঁট এসে পড়ছে ওর চোখে-মুখে। সেই কারণে অনেকে জানলা বন্ধ করে রেখেছে আবার অনেকে ঐশীর মতো বৃষ্টির ফোঁটাকে মেখে নিচ্ছে শরীরে।

এই বৃষ্টির মধ্যেও বাইরে যথেষ্ট ভিড় ,পুজো যে আর কয়েকদিন মাত্র বাকি। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব বলে কথা। তাই এই বর্ষাতেও রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছে। রাসবিহারী এভিনিউয়ের রাস্তা ধরে বাসটা ধীরে গতিতে এগিয়ে চলেছে ট্রাঙ্গুলার পার্ক পেরিয়ে গড়িয়াহাট কমপ্লেক্সের দিকে।
এদিক দিয়েই যদিও হামেশা তার যাতায়াত । যাদবপুর ইউনিভার্সিটির তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ঐশী।
কলেজে প্রতিদিন দুবেলা এই পথ দিয়েই তাকে যাতায়াত করতে হয়।

হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠতে কিছুটা চমকে উঠলো।
ঋদ্ধির ফোন এসেছে, কিছুটা বিরক্তের সাথে বললো “হ্যাঁ কি বলবি বল?”
ওপার থেকে ঋদ্ধি চিন্তিত স্বরে বললো “কি ব্যাপার আজ কলেজ এলি না যে ? ফোনটাও অফ ছিলো তোর, অনেকবার কল করেছি।
একটু চটে গিয়ে ঐশী বললো - “কেন, সব কৈফিয়ত কি তোকে দিতে হবে?”
একটু ইতস্তত করে ঋদ্ধি বললো - “না, তা নয়। তুই তো হঠাৎ করে এমন কিছু করিস না, তাই আর কি, সবাই খোঁজ করছিলো! বাই দ্য বে, এত নয়েজ, মনে হচ্ছে তুই বাড়িতে নেই, কোথায় তুই?”
“আমি একটু শপিং করতে বেরিয়েছি ” কথাগুলোর মাঝখানেই বাইরের শব্দের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ঐশ্য অধৈর্য হয়ে ঠোঁটের মধ্যে একটা শব্দ করে। ওপারের মানুষটাকে কিছু বলতে না দিয়েই “পরে কল করছি” বলেই এক নিমেষে ফোনটা কেটে দেয়।
“কি ব্যাপার, মেজাজ বিগড়ে আছে মনে হচ্ছে তোর?” লিহা তার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়।
“না রে, তেমন কিছু না। ” বলে জানলার দিকে আবার মুখ বাড়ায়, বৃষ্টিটা থেমে গেছে প্রায়। লিহা আর কথা বাড়ায় না, ও কিছুটা হলেও আঁচ করেছে।
লিহা ঐশীর বন্ধু। শুধু বন্ধু নয় একবারে প্রতিবেশী বন্ধু ওরা। ছোটো থেকে বড়ো হয়েছে একসাথে। ঐশীর ঠিক আগের বাড়িটাই লিহাদের। একসঙ্গে স্কুলে আর কলেজেও পড়েছে শুধু দুজনের সাবজেক্টটা চেঞ্জ হয়ে গেছে কলেজে এসে। লিহা সোশিয়লজির স্টুডেন্ট আর ঐশী হিস্ট্রির।
সকালে হঠাৎ করেই লিহাকে ঐশী বলে যে আজ কলেজ যাবে না আর তাকেও যেতে দেবে না। দুজনে কেনাকাটা করতে বেরোবে। লিহাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলে রেডি হয়ে নিতে। আর লিহা জানে ঐশীর মাথায় ভূত চাপলে তাকে ঠেকায় কার সাধ্যি! একবার যখন বলেছে তখন তা প্রত্যাখ্যান করতে করতে এমনিতেই কলেজের সময় শেষ হয়ে যাবে, তাই নিরুপায় হয়ে রাজি হয়ে যায় ও। ছোটো থেকে দেখে আসছে ঐশীকে মুড সুইংটা একটু বেশিই করে ওর, আর মনমরাও হয়ে যায় ইচ্ছে মতো। দুমদাম কথা শুনিয়ে দেয় আবার পরক্ষণেই নিজেই সব ঠিক করে নেয়। তবে ওর মনটা খুবই ভালো, তাই এসব বেশিক্ষণ স্থায়ী থাকে না।কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিপরীতও ঘটে বইকি।
*******
বাড়ি যখন ফেরে তখন প্রায় বিকাল গড়িয়েছে। ঘড়িতে সাড়ে চারটে বাজতে চললো।
নিজের রুমে ঢুকে সদ্য কেনা ম্যাগাজিনগুলোর পাতা ওল্টাতে থাকে। কিন্তু আজ আর ভালো লাগছে না সবই বিরক্তিকর লাগছে। বইটা বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। “ফোনটা আবার বেজে ওঠে। ঋদ্ধির কল। স্ক্রিনে নামটা দেখেই কলটা কেটে দেয় ঐশী। সাথে সাথে ফোন টেক্সট আসে “এরকম কেন করছিস! ছোটো-খাটো ব্যাপার নিয়ে।”
কিছু রিপ্লাই না করেই ফোনটা সাইলেন্ট মোডে রেখে আবার বালিশে মাথা রাখে ঐশী।
রাতে আবার কল করে ঋদ্ধি। এবারেও কলটা কেটে দেয়। ঐশীর রাগ কমছে না কিছুতেই।
একটা ছোটো মেসেজ করে “প্লিজ, আমাকে একটু একা থাকতে দে। গুড নাইট।”

***********
ঋদ্ধি বুঝতে পারছে না, কি করে ঐশীকে বোঝাবে, যে ও যা ভাবছে তা একদমই ভুল। সুনেত্রাকে ও লিফট দিতে চায় নি। কিন্তু কি করবে ক্লাসমেট। রাস্তায় সমস্যায় পড়েছিলো, তাই কলেজে যখন একই পথ ধরে আসছে তখন না বলার কোনো স্কোপ পায়নি। ঋদ্ধি জানতো ঐশী জানলে রাগ করবে তাই আগেভাগেই কলেজের গেটের একটু আগেই ওকে নামিয়ে দিয়ে বলেছিলো “তুই যা, আমি ওই সামনের দোকান থেকে একটু ঘুরে আসছি।”
সুনেত্রা একগাল হেসে বলেছিলো “ওহ, বুঝেছি! ঐশী তোকে আমার সাথে দেখে নিলে ব্রেক আপ করে দেবে বুঝি ?”
ঋদ্ধি কিছু বলে না। একটু হেসে বাইকের এক্সেলেটারে চাপ দিয়ে এগিয়ে যায়।
কিন্তু বিপদ কি আর পেছু ছাড়ে! যা হওয়ার আগেই হয়ে গেছে। ক্লাসে ঐশীর এক বন্ধু ওদের দেখে ফেলে রাস্তায়, আর সেই কথাটা ঐশীকে মজা করেই বলে বসে। আর যায় কোথায়!
এমনিতেই সুনেত্রাকে একদম না পাসান্দ ঐশীর। তার যথেষ্ট কারণও আছে। ঋদ্ধি আর ঐশীর সম্পর্ক আছে জেনেও সুনেত্রা ঋদ্ধির সাথে বেশ কয়েকবার ফ্লার্ট করার চেষ্টা করেছিলো। সেই নিয়ে আগেও ছোটোখাটো ঝামেলা হয়েছে ওদের মধ্যে। কিন্তু এবারে ঋদ্ধির বাইকের পিছন সিটে বসাটাকে একদম মেনে নেয়নি ঐশী। অতটা পজেসিভ নয় কিন্তু ওই যে একটুতেই রাগ করে বসে আর সুনেত্রার ব্যাপারটা একদমই আলাদা। আগের ঘটনাগুলো ও জানতো তাই ওর চালচলন হাব-ভাব একদম ভালো লাগে না ঐশীর।

************
পরের দিন কলেজে গিয়ে ঋদ্ধিকে আভোয়েড করতে থাকে ঐশী।
অনেকবার কথা বলতে যেতে চাইলেও সুযোগ দেয়নি সে। শেষে অফ পিরিয়ডে ঋদ্ধি হাতটা চেপে ধরে ঐশীর “প্লিজ এরকম করিস না। আমার একদম ভালো লাগছে না”
“হাতটা ছাড় ঋদ্ধি, আমি কিছু শুনতে চাই না। আমাদের মধ্যে আর সম্পর্ক না থাকাই ভালো ”
“এত ছোটো ব্যাপার নিয়ে এরকম করিস না প্লিজ” ঋদ্ধি অনুনয়ের সাথে কথাটা বলে।
“ছোটো ব্যাপার! তোরা দুজনে যেখানে পারিস ঘুরে বেড়া, আমার কিছু জানার প্রয়োজন নেই।”
“আরে বাবা, কোথাও যাইনি। কলেজে আসার সময় রাস্তায় ওর সাথে দেখা হয়, আর ও অনেক করে লিফট চাইলো, তাই বাধ্য হয়ে নিয়ে এলাম। আর কিছুই না।”
তাহলে কলেজে একসাথে ঢুকলিনা কেন?”
“তুই ভুল ভাববি, তাই আমি আগেই নামিয়ে দিয়েছি বাইক থেকে, প্লিজ, ট্রাস্ট মি ঐশী।”
“ওহ! তার মানে আমাকে লুকিয়ে আগেও অনেকবার এসব করেছিস, আজ জানতে পারলাম বলে তাই আমাকে এসব কারণ দেখাচ্ছিস।”
“ তুই আমাকে ভুল ভাবছিস, আর অযথা কষ্ট পাচ্ছিস!”
“আমি কষ্ট পাচ্ছি না, আমি ভালো আছি। দেখ তোর সাথে দুদিন কথা হয়নি। আমি কি থাকতে পারছি না? ”
“ না, তুই ঠিক নেই, আমি জানি তুই ঠিক থাকতে পারিস না।”
একটু হেসে ঐশী জবাব দেয় “মোটেই না, আমি নিজেকে সামলে নিয়েছি। আমি ভালো আছি! এরকম রোজ রোজ মেনে নেওয়া আমার পক্ষে ইম্পসিবল! তাই এখন থেকে আমি আমার মতো আর তুই তোর মতো থাক”
কথাগুলো বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল ঋদ্ধির মনে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললো “ এই কথাগুলো তুই রাগের বশে বলছিস। এতে আমি তো খুশি থাকবো না। আর তুইও আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবি না, আমি এটুকু বলতে পারি।”
আবার একটু হাসে ঐশী “শোন চ্যলেঞ্জ করিস না। আমি ডিসিশন নিয়ে নিয়েছি। অনেকদিন ধরে এসব চলছে। এত ঝামেলার মধ্যে একটা সম্পর্ক চলতে পারে না । এই কয়েকটা বছরে সব বদলে যেতে পারে না তাই এবার আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত তাতে তোরও ভালো আর আমারো। ”
বুকে পাথর চেপে, ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি টেনে ঋদ্ধি বলে “আর যদি আমি চ্যালেঞ্জ করি, সম্ভব না। এই কয়েকদিনে আমাদের কাটানো মুহূর্তগুলো তুই ভুলে যেতে পারিস না ঐশী। আমাদের ভালোবাসার সময় গুলো এইভাবে শেষ হয়ে যেতে পারে না।অনেক স্বপ্ন দেখেছি আমরা। তবে কি সব মিথ্যে? ”
“তুই জানিস আমি যা বলি তাই করি। আর প্লিজ, আমাকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করিস না।”
“আমি তোকে বেঁধে রাখিনি আমরা একে অপরকে জড়িয়ে আছি শুধুমাত্র। যা কখনই মিথ্যে হতে পারে না। তাহলে এতদিনের সমস্ত কিছুই মিথ্যে হয়ে যাবে!”
“প্লিজ ঋদ্ধি , আমি এসব শুনতে চাইনা!”
“বেশ, আমি তোর ডিশিসন মেনে নেবো। তুই যা চাইবি তাইই হবে। কিন্তু তার আগে আমার একটা কথা মানতে হবে তোকে। এটা তোর কাছে আমার শেষ দাবি, ইচ্ছে বা আর্জি যাইই বলিস”
মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকায় ঐশী তারপর বলে “আচ্ছ,বল। শুনি কি দাবি তোর?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঋদ্ধি। কন্ঠ ভারি হয়ে আসে। নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে বলে “তোর জন্য একটা টাস্ক আছে।”
“টাস্ক!”
হুম, টাস্ক বলতে পারিস। তোকে আমার জন্য আর তিনটে দিন দিতে হবে। না, ভয় পাস না। আমি তোর সাথে থাকবো না। কিন্তু এই কয়েকটা দিন তোকে আমার জন্য কিছু জায়গায় যেতে হবে, সে তুই একা যেতে পারিস বা তোর কাছের কোনো মানুষকে নিয়েও যেতে পারিস। আমি তোকে কয়েকদিনের একটা লিস্ট বানিয়ে দিচ্ছি।” খুব ঠান্ডা ও দৃড়ভাবে কথাটা বলে ব্যাগ থেকে খাতা পেন বের করে ঋদ্ধি। চটপট কিছু একটা লিখে হাতে ধরিয়ে দেয়। মুখের দিকে একবার তাকিয়ে কাগজটা ভাঁজ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলো ঐশী।
হুম, তোর টাস্ক শেষ হচ্ছে ষষ্ঠীর দিন। তারপর না হয় জানাস তোর ডিসিশন। তুই যা ঠিক করবি তাই হবে সেদিনের পর ”
কলেজ থেকে বেরিয়ে আসে ঐশী। মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে কথাগুলো। এসব কেন বললো ঋদ্ধি
বাড়ি ফিরে মাথায় চেপে বসে ব্যাপারটা, ফিরে এসেই কাগজটা পড়েছিলো, কয়েকটা জায়গার নাম লিখেছে যেসব জাগয়ায় ওরা আগে অনেকবার গেছে। অনেক সময় কাটিয়েছে কয়েক বছর। রাতে পড়ার টেবিলে বসে কাগজটা আরেকবার খুলে দেখে নেয়, আগামীকাল বইপাড়া মানে কলেজ স্ট্রিটে যেতে বলেছে ঋদ্ধি। কাগজটা ভাঁজ করে রেখে দেয় সে।
সকালে উঠে রেডি হয়ে একা একাই বেরিয়ে পড়ে কলেজ স্ট্রিটের পথে।
এইখানে তাদের প্রেম হওয়ার শুরু থেকে প্রেম হওয়ার পরে অনেক সময় কাটিয়েছে, ফটিকদার চায়ের দোকান বা কফিহাউসের কফি ফিস কবিরাজির গন্ধ যেন তার নাকে ভেসে বেড়াচ্ছে। আজ এই পথে যেন চলতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। যদিও ও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল রাস্তাঘাটের ব্যাপারে কিন্তু ঋদ্ধি এসব জায়গায় ওর হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতো যাতে ভিড়ের মাঝে পিছিয়ে না পড়ে। এত লোকের ভিড়ে মনে পড়ে যাচ্ছে সারি সারি দোকানের এটা-ওটা দেখানোর জন্য তার নাম ধরে মাঝে মাঝেই ডাকতো।তখন বেশ লাগতো। আজ কফি হাউসের দিকে পা বাড়াতে গিয়েও ইচ্ছে হলো না ঐশীর। একা একা যাবে। কেমন একটা উদ্ভট মনে হলো ওর। না ওর ইচ্ছে করছে না আর এখানে থাকতে।
মনে মনে ভাবলো, একা একা না এলেই হতো।
ডিসিশন নিলো পরের দিন একা আর আসবে না।
***********
নিজের মনকে শক্ত করার চেষ্টা করছে ঐশী। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হচ্ছে ফেসবুকটা অন করবে, কিন্তু কেমন যেন একটা ভেতর ভেতর হচ্ছে। দেখতে ইচ্ছে করছে ঋদ্ধি কি করছে! আছে কি না। পরক্ষণেই মনে হচ্ছে তাহলে ওর চ্যালেঞ্জ মিথ্যে হয়ে যাবে। এটা ওর সারাজীবনের ব্যাপার, ইদানিং মনে হচ্ছিলো ওদের মধ্যে আদৌ কি ভালোবাসা অবশিষ্ট আছে! বেশিরভাগ সময়ই কিছু না কিছু নিয়ে ঝামেলা লেগে থাকতো ওদের মধ্যে। অনেকবার মনে হয়েছিল আর নয়, এ সম্পর্কের ইতি এখানেই হওয়া উচিত, কিন্তু প্রত্যেকবারেই কিসের কারণে আটকে নিয়েছে, আগলে নিয়েছে ঋদ্ধি তাকে।
কিন্তু আর না। টেবিল ল্যাম্পটা নিভিয়ে চোখ বন্ধ করে ঐশী।

সকাল হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ, উঠে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো, মা লিহা এসেছে?
“কেন রে? আজ আবার কোথায় যাবি? তোর কি আজও কলেজ নেই? নাকি ঠাকুর দেখা স্টার্ট হয়ে গেছে? ”
“না না, আমরা একটু বেরোবো টুকটাক কেনা কাটা করতে”কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে কথাটা বলে।
ঐশীর মা এগিয়ে আসে ওর দিকে। মুখের দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে বলে “ এই তোর চোখ মুখের এই অবস্থা কেন? রাতে ঘুমাস নি নাকি? কি করিস বল তো? এই তোদের এক জেনারেশন হয়েছে, না আছে খাওয়া না আছে ঘুম! সারাদিন এটা সেটা নিয়ে পড়ে থাকিস! সারারাত কি ফোনে বকবক করিস নাকি ? এরকমটা করিস না, শরীর খারাপ করবে দুজনেরই”
“উফ মা, থামবে এবার। তুমি ওর কথা বাদ দাও তো” মুখ কাঁচুমাচু করে কথাগুলো বলে ঐশী।
“ওহ, আবার তার মানে কিছু হয়েছে তোদের মধ্যে। এই একটা মেয়ে হয়েছে...”কথার মাঝেই হঠাত কলিং বেল বেজে ওঠে।
“ওই যাও দেখো, লিহা এলো মনে হয়” ঐশীর মা গিয়ে দরজা খোলে।
হ্যাঁ, লিহাই এসেছে। ভেতরে এসে অপেক্ষা করতে লাগলো ঐশীর জন্য। গতকালই ফোন করে দিয়েছিলো লিহাকে আজ আসার জন্য। এখনো যদিও বলেনি কোথায় যেতে হবে।
লিহা প্রশ্ন করলে বলে “চল তো আগে, দেখতে পাবি কোথায় যাই”

ওরা প্রিন্সেপ ঘাটের কাছে যখন এসে পৌঁছালো তখন ঘড়িতে দশটা বাজতে যায়। দুজনে এসে দাঁড়ালো গঙ্গার পারে। হালকা হাওয়ায় চোখে-মুখে চুলগুলো উড়ে এসে পড়ছে বারেবারে। ও বরাবরই চুল খোলা রাখতে ভালোবাসে। মুখের ওপর এসে পড়া চুলগুলো আঙুলে করে কানের পাশে সরাতে গিয়ে হঠাৎ করে যেন কেমন হয়ে গেল মনটা। মনে পড়ে গেল, এই ফেরি ঘাটে কত দিন একসাথে গল্প করেছে। সকাল থেকে বিকাল পেরিয়ে যেত কখন তার খেয়াল থাকতো না। কাঁধে মাথা রেখে গুনগুন করে গান করা আর একে অপরকে নিয়ে নানারকম স্বপ্ন দেখা। আর কথার মাঝে যখনই চুলগুলো মুখের ওপর এসে ঐশীকে অস্বস্তিতে ফেলতো তখন খুব আলতো করে ঋদ্ধি তাদের সরিয়ে দিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতো। বলতো “জানিস ঐশী, তোর চোখগুলো ভারি অদ্ভূত, মায়াময়। কেমন যেন নেশাধরা” তখনি পিঠে আলতো একটা চড় এসে পড়তো। তারপর আবেগঘন হয়ে পড়তো দুজনেই।
লিহা বেশ কয়েকবার ডাকার পরে সংজ্ঞা ফিরে পেলা।
“কি রে কি ভাবছিস, শুনতেই পাচ্ছিস না যে! বলছি কি ওই পারে যাবি নৌকায়? ”
“না থাক”মিহি স্বরে উত্তর দেয় ঐশী। গঙ্গার জলের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে এই তো পাশে ঋদ্ধির ছায়া। তার পাশেই তো দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। কেন এমন মনে হচ্ছে তার! দু পা ওপরে উঠে আসে।
না, আর ইচ্ছে করছে না। কেন জানে না। কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। আজ তো ও একা আসেনি। ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু এসেছে! তবে কেন এমন হচ্ছে!
“এই চল বাড়ি ফিরে যাই”বলেই হন্তদন্ত হয়ে উঠে আসে ঐশী।
লিহা কিছু বললো না, কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছে কারণটা কি। মনে মনে সেও হাসলো।
ফিরে এসে খেতে ইচ্ছে করলো না ওর। কথাও বলতে ইচ্ছে করছে না। ঘুমিয়ে পড়েছে কখন খেয়াল নেই। সন্ধ্যা নেমেছে। বাইরে আলোর রশনাই, পুজো যে এসে পড়েছে। চতুর্থীর শেষ তড়জড় চলছে পাড়ার প্যান্ডেলের। পাশের পাড়াতেই ঋদ্ধির বাড়ি। ফোনটা হাতে নিলো ঐশী। সাধারণত ফোনটা জেনারেল মোডেই থাকলেও আজ মনটা ভালো নেই বলে সাইলেন্ট করে দিয়েছিলো। অযথা কোনো কল এসে ডিস্টার্ব না করে। ফোনের নোটিফিকেশন চেক করে দেখলো, কয়েকটা কল আর মেসেজ এসেছে বটে কিন্তু তার মধ্যে একটাও ঋদ্ধির নয়। মোবাইল ডেটা অন করে দেখলো মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপ লিস্টে ওর কোনো মেসেজও আসেনি। ইন ফ্যাক্ট এই কয়েক ঘন্টায় ও মোবাইল ডাটা অনও করেনি। মনে মনে ভীষণ রাগ হলো ঐশীর। কেন হলো ও নিজেও জানে না।
ওর খামখেয়ালিটা আজ নয় ছোটো থেকেই, এর কারণে অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছে। অনেক বন্ধুও চলে গেছে ছেড়ে৷ তবুও যায় নি এই খামখেয়ালি স্বভাব। ঋদ্ধির কাছ থেকেও এর আগে ও অনেকবার চলে আসতে চেয়েছে, কিন্তু ও আটকে দিয়েছে প্রত্যেকবারে।
মায়ের ডাকে খাবার টেবিলে এসে বসলো। কিছুটা খাবার খেয়ে আর মায়ের ওপর অনেকটা রাগ দেখিয়ে তার খাওয়া শেষ হলো। রাতে বিছানায় ঘুম আসছে না ওর। এদিক ওদিক পায়চারি করে ছাদে এসে দাঁড়ালো। আকাশটায় আজ একটাও তারা নেই। ওর চোখ আকাশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ঘুরে বেড়ালো। না সত্যিই একটাও তারা নেই! হয়তো আছে, মেঘের আড়ালে, কিন্তু মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে। এমন অনেক কিছু থাকে যা আমরা দেখতে পাইনা । উপলদ্ধিও করতে পারি না। না থাকলে তখন তার শূণ্যস্থান চোখে পড়ে। ছাদের ঠান্ডা হাওয়ায় চোখ ভারি হয়ে এলো এবার। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মনে পড়ে গেল এরকম কত না বৃষ্টিতে একসাথে বাড়ি ফিরেছে। ওকে যতটা পারতো আগলানোর চেষ্টা করতো, যেমনটা ছোটোবেলায় স্কুল ফেরার পথে বাবা করতো। এখন বৃষ্টিতে ভিজছে জানলে খুব রাগ করতো ঋদ্ধি। চোখটা ভিজে আসে। বৃষ্টির জল তাতে মিশে ঘনত্ব বাড়িয়ে তোলে। নীচে নেমে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে জানে না। মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙলো। ঘুম চোখে দরজা খুলে দিয়ে বললো “আহা, সকাল সকাল এত ডাকাডাকি করছো কেন?”
“ন'টা বাজতে চললো, ঘড়িটা দেখেছিস? কাল রাতে বললি যে আজ কলেজে যাবি।
মুখে হাত দিয়ে একটা হাই তুলে বললো “লিহা এসে পড়বে ওকে একটু ওয়েট করতো বলো আমি রেডি হচ্ছি।
*********************
কলেজটা আজ প্রায় ফাঁকাই, যেহেতু কাল থেকে কলেজ ছুটি তাই আজ তেমন আর ভিড় নেই। আফটার অল আজ পঞ্চমী। তাই পুজোতে হয়তো অনেকেই ঘুরতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
কলেজের গেটেই দাঁড়িয়ে পড়লো ঐশী। বাইরের দিকে একবার তাকালো।
কি জানি কেন। গেট থেকে ক্যাম্পাসের ভেতরে এলো। কয়েকজন আড্ডা দিতে ব্যস্ত। এইখানেই কত সময় কেটেছে ঋদ্ধি আর ঐশীর।

ক্লাসের ভেতর ঢুকলো। আজ যেন অদ্ভূত লাগছে ক্লাসটা। সেই চেনা রুম, সেই চেনা বন্ধুরা। তাও যেন রুমের ভেতরে পা রাখার পরে সবাইকে কি জানি কেন খুব অচেনা মনে হচ্ছিলো। সবই আছে তবুও যেন কি একটা নেই। কি নেই? এমন মনে হচ্ছে কেন! ক্লাস চলছে, যেন সময় কাটছে না ওর, রিস্টওয়াচের দিকে তাকালো সবে দশ মিনিট হয়েছে। কিন্তু যেন কয়েক ঘন্টা পার করে গেছে। মোহনা ম্যামের হিস্ট্রি ক্লাস, বরাবরই প্রিয়। তাও আজ বোরিং লাগছে খুব। ভেতর থেকে কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে বারবার। পাশে অন্য একজন বন্ধু বসে আছে। এইখানে ঋদ্ধি বসতো। প্রায় না বসলেও মাঝে মাঝে। তাও আজ বারবার ওকেই যেন মিস করছে। ক্লাস শেষে বাইরে এলো এসে ক্যান্টিনের একটা টেবিলে এসে বসলো। লিহা এখনো ক্লাস করছে। ওর অন্য রুম। একটা মেসেজ করে দিলো। যে ও বাইরে অপেক্ষা করছে। মেসেজের রিপ্লাই পায়নি। হয়তো ক্লাসের ফাঁকে ফোনে নজর পড়ে নি লিহার।
বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে একমনে মনটা কেমন যেন লাগছে ৷ যতই ভাবছে স্বাভাবিক হবে হতে পাচ্ছে না। আজ সুনেত্রাও কলেজে আসেনি আর ঋদ্ধিও। আবার মনে আজে-বাজে চিন্তা আসছে। মনটাকে অন্যদিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করলেও বারবার ফিরে আসছে একই জায়গায়। এই ক্যান্টিনে বসে কত গল্প,আড্ডা কত খুনসুটি করেছে ওরা। হঠাৎ মনে পড়ে যায় থার্ড ফ্লোরের নয় নম্বর রুমের কথা। ফাস্ট ইয়ারে ওটাই ওর ক্লাস রুম ছিলো। উঠে পড়ে ঐশী। অনেকদিন যাওয়া হয়নি ওই ঘরটায় ধীর পায়ে ওপরের দিকে পা বাড়ায়। যত পা বাড়ায়, পুরানো স্মৃতিগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। এই দু বছরে ওই রুমে আর ক্লাস হয়নি ওদের তাই যাওয়া হয়নি। এইখানেই ওর আর ঋদ্ধির প্রথম প্রেম শুরু হয়। মনে পড়ে যায় সেই দিনের কথাটা। তারিখটা মনে নেই যদিও তবুও যেন সবকিছু এখনো স্পষ্ট।
সেদিন টেবিলের ওপর ঋদ্ধি ধারালো পিনের মতো কিছু একটা দিয়ে ঐশীর নামটা খোদাই করছিলো। আর ওর নজরে পড়ে যায়। ঋদ্ধিকে জিজ্ঞাসা করে, এসব কি? কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে ঋদ্ধি। এর আগে ওদের দুজনের মধ্যে তেমন কথাও হয় নি। শুধুমাত্র ক্লাসমেট হিসাবে যতটুকু, ততটুকুই ব্যস। ঐশীর এরকম প্রশ্নে সেইসময় খুব ভয় পেয়েগিয়েছিলো ঋদ্ধি, তা ওর মুখ চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো। যেহেতু ক্লাসে একজন ভালো ছেলে হিসাবেই পরিচিত, তাই বেশি কিছু বলে না ঐশী এবং আরো একটা কারণ আছে, ঐশীরও ওকে ভালো লাগতে শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন হলো ।আসলে ঐশীর কানে আগেই পৌঁছেছিলো যে ঋদ্ধি ওকে পছন্দ করে, তাই বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে বেঞ্চে লেখা ঐশী নামটা অন্য কেউ নয়। বেশ কিছুক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার পরে ঋদ্ধি ধীরে ধীরে বলেছিলো “জানিনা, কেন, মাথায় ঘুরছিলো তাই কখন যে লিখে ফেলেছি খেয়াল করিনি... সরি।
“কি বললি”একটু ধমকের সুরে কথাটা বলে ঐশী।
পরক্ষণেই ক্লাসে টিচার চলে আসায় ঝগড়া পর্ব সেখানেই স্থগিত হয়ে গেল। আর শুরু হলো এক নতুন গল্প। তারপর ধীরে ধীরে ওরা কবে যে ভালোবাসায় হাবুডুবু খেতে শুরু করলো, তার আর দিন-ক্ষণ খেয়াল নেই দুজনেরই। বন্ধুত্ব বাড়তে থাকে সাথে ভালোবাসার গভীরতাও।
একদিন সেই বেঞ্চে ওর নামের পাশে ঋদ্ধির নামটা লিখে দেয় ঐশী।
তারপর কেটে গেছে অনেকদিন। সেকেন্ড ইয়ার তারপর থার্ড ইয়ার। আর এই রুমে আসা হয়নি ওর। আজ প্রায় দু'বছর পরে এই রুমে আসে ঐশী। এখন ক্লাস নেই মনে হয় এই রুমে। ক্লাসটা ফাঁকা। রুমের চারিদিকে তাকায় ও। কানের কাছে বাজছে সব পুরানো কথাগুলো, প্রথম প্রেমের দিনগুলো শুরু এখান থেকে, ভুলতে চাইলেও ভোলা যায় না হয়তো। একদিন তো ক্লাস থেকে বেরোনোর সময় হঠাৎ করে ওর গালে একটা কিস করে দেয় ঋদ্ধি, ওটাই ওর প্রথম ঠোঁটের স্পর্শ। কিছু বোঝার আগেই দুম করে যে এই কান্ডটা করে বসবে তা বুঝতে পারেনি ঐশী, একটু লজ্জা পেয়েছিলো, কিন্তু আসলে ওর ভালোই লেগেছিলো। যদিও ঋদ্ধিকে বুঝতে দেয়নি। তাই কিছুক্ষণ চুপচাপ ছিলো। ঋদ্ধি তার জন্য বারবার ক্ষমা চেয়ে নেয় তার থেকে। তারপর এরকম মুহূর্ত যে কতবার ঘটেছে, তার হিসাব নেই।
ধীরে ধীরে এলো সেই বেঞ্চের কাছে। লেফট সাইডের ফোর্থ নম্বর বেঞ্চ। আর একটু কাছে আসার পরে দেখতে পায় তাদের নামগুলো। স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে ইংরেজি শব্দে পাঁচটা লেটার “ঐশী” কিন্তু, একটু অবাক হলো একটা ব্যাপারে। পাশে লেখা ঋদ্ধি নামটাও আছে বটে কিন্তু সেটা অতটা স্পষ্ট নয়। তার জৌলস ফিকে হয়ে গেছে। এই কয়েক বছরে হালকা হয়ে এসেছে তার গভীরতা। ভালো করে লক্ষ্য করে ঐশী। না কিছু ভুল নেই ঠিকই দেখেছে, কিন্তু ঋদ্ধির নামটাই বেশি স্পষ্ট হওয়া উচিত কয়েকদিন পরে হলেও নামটা অবশ্যই পরে লেখা হয়েছে। তাহলে!
আসতে আসতে স্পষ্ট হয় ব্যাপারটা “ঋদ্ধি কি এখানে আসতো মাঝে মাঝেই?” নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে ও। চোখে একরাশ মেঘ নেমে আসে।এই বুঝি বৃষ্টি নামবে ছলছল করে চোখদুটো।
অস্পষ্ট চোখে ঋদ্ধির নম্বরে কল করে...
কয়েকটা রিং হতেই ওপার থেকে খুব শান্ত ও গভীর স্বরে বলে ঋদ্ধি “হ্যাঁ, বল?”
কাঁপা কাঁপা গলায় ঐশী বলে “তুই আমাদের ফার্স্ট ইয়ারের রুমে প্রায় আসতিস?”
কিছুটা থেমে আবার সেই শান্তভাবেই ও উত্তর দেয়“হ্যাঁ, প্রায় বলবো না। তবে মাঝে মাঝে আসতাম। আসলে যখনই তোর আর আমার খারাপ সময় আসতো তখনই আমি ওই রুমে আসতাম।”
আর বুঝতে বাকি রইলো না ঐশীর, কিছু না বলে ফোনটা কেটে দিল মুখের ওপর তারপর অঝোরে কাঁদতে লাগলো টেবিলের ওপর মাথা রেখে।
তার মানে এতদিন যখনই ওদের মধ্যে মান-অভিমান হয়েছে তখন ঐশী রাগ করে কথা বলেনি বেশ কয়েকদিন। কিন্তু ঋদ্ধি ওকে কিছু বলেনি, নীরবে কষ্ট পেয়েছে আর এই ঘরে এসে স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরেছে বারবার। ওর নামটাকে ঠিক আগের মতোই লিখে যেত। তার ওপর দাগ কেটে তাজা করে রাখতো। মুছে যেতে দেয়নি ঐশীকে টেবিল থেকে আর ওর জীবন থেকেও।
ঋদ্ধি আর কল ব্যাক করেনি ওকে, কারণ আগেই বলেছিলো, যে ও আর কল করবে না। ষষ্ঠীর দিন ওর চিরকূট অনুযায়ী কাজ শেষ হলে যেন ওকে জানায় ওর ফাইনাল ডিসিশন।
বাড়ি ফিরে আর কারোর সাথে কথা বলেনি ঐশী।
আজ শেষ দিন কথা অনুযায়ী আজ বাড়িতে থাকার কথা কোথাও যাওয়ার নেই আজ তার। বাড়িতে থেকেও কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে রাগ আর অভিমানের মিশ্রণে সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে ওর। তার মানে প্রতিবারই ঋদ্ধি এইগুলোই পুণরাবৃত্তি করেছে যখন তাদের সম্পর্কে ছেদ পড়েছে। সেই সব জায়গায় বারবার গেছে যেখানে তারা বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছিলো। আর সবশেষে এটাই বুঝতে পারতো, আর যাই হোক না কেন ঐশীকে ছাড়া কিছু যেন একটা নেই তার জীবনে। ও ভালো করে এটাও জানতো ঐশীরও একই হাল হবে তাই শত বাধা-বিপত্তিতেও ছেড়ে যায়নি। ঐশীর বারবার রাগ করার পরেও মানিয়ে নিয়েছে, হাতটাকে শক্ত করে ধরে রেখেছিলো। কিন্তু কোনোদিন তা ব্যক্ত করেনি। আজ তা বুঝিয়ে দিলো এইভাবে।
সপ্তমী পেরিয়ে অষ্টমীর সকালও কেটে গেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। না, ঋদ্ধির কাছে ঐশীর কোনো কল আসেনি, কোনো টেক্সটও নয়। দুশ্চিন্তা হলো একটু।
তাহলে কি ওর মনে কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই সবই কি শেষ হয়ে গেছে! দুদিন পেরোতে চললো। যত সময় পেরোলো ততই ওর অস্বস্তি বাড়তে থাকলো। একটা অজানা ভয় যেন ওকে চেপে ধরলো। একরাশ হতাশ আর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কিছু হারিয়ে ফেলার পর মনে হয়, নাহ! যা হচ্ছে বা ঘটছে সবই আসলে স্বপ্ন, এখনি ঘুম ভাংবে আর সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য ছুটতে গিয়ে শেষে সত্যিগুলোকেও স্বপ্নের সাথে গুলিয়ে ফেলি বোধহয়।

বাড়ির কাছেই পাড়ার মন্ডপ। কিন্তু ইচ্ছে করলো না ঋদ্ধির। জীবনে অনেকবার হেরেছে কিছু সময় সত্যিই আবার কিছু সময় ইচ্ছে করেই। কিন্তু কাছের মানুষকে হারানোর যন্ত্রণাটা হয়তো আলাদা রকম। ফোন সুইচ অফ করে দেয়। ভালো লাগছে না কিছু। সারা শরীর যেন ঝিমঝিম করছে। বালিশে মাথা রাখে। চোখ বন্ধ করে। আজ ভীষ্ণ দূর্বল লাগছে নিজেকে।
ঘুম যখন ভাঙে সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। । বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জল দেয় ঋদ্ধি। আয়নাটা বলে দিচ্ছে এই কয়েকদিনে তার মুখে চিন্তার ছাপ পড়েছে। চোখের কোনে কালচে অর্ধ চাঁদের ছায়া পড়েছে।
মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসে। বাড়ির সকলেই প্রায় পুজো নিয়ে ব্যস্ত৷ কচি-কাচারা বে্রিয়ে পড়েছে ঠাকুর দেখতে। হঠাত ফোনটা বেজে ওঠে। যা আশা করেনি তারই কল এসেছে, হুম ঐশীর। ভেতর থেকে আনন্দের সীমা থাকে না। ফোনটা তুলে কানে দেয়।
খুব ছোটো দুটো কথা বলে ফোন রাখে ঐশী “তোকে কিছু ফেরত দেওয়ার আছে, সন্ধ্যে সাতটায়, তোর পাড়ার প্যান্ডেলের সামনে দেখা কর।”
না, যা ভেবেছিলো তা নয়। এতদিনের সম্পর্কে কিছু তুচ্ছ জিনিস হয়তো ফেরত দিতে আসছে। কিছু বলার সুযোগ দেয়নি ঐশী, ফোনটা কেটে দেয়। কল করার চেষ্টা করে কিন্তু কল লাগে না। ঘড়ির দিকে তাকায়, ছ'টা বেজে পঁচিশ মিনিট। গায়ে একটা পাঞ্জাবি চাপিয়ে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে প্যান্ডেলে গিয়ে অপেক্ষা করে ওর জন্য। সাতটা বাজতে এখনো মিনিট পাঁচেক বাকি।
ঠিক সাতটা বেজে পাঁচ মিনিটে কল এলো ঐশীর।
ফোন তুলতেই ওপার থেকে মৃদু স্বরে বললো একটু প্যান্ডেলের বাইরে আয়। আমি অপেক্ষা করছি।”
ঋদ্ধি কাঁপা কাঁপা গলায় বললো “তুই এখানে আসতে পারিস, আমার কোনো অসুবিধা নেই”
এবার বাজখাঁই মেজাজে ঐশী বললো “তোর সমস্যা না থাকতে পারে, আমার আছে। আমি ওখানে কোনোরকম সীন ক্রিয়েট করতে চাই না।”
অগত্যা কল কেটে এগিয়ে আসে প্যান্ডেলের বাইরের দিকে। দূর থেকে দেখতে পায় একটা গাড় গোলাপী আর হলুদের কম্বিনেশনে শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে ঐশী। যত সামনে আসে বুঝতে পারে ঋদ্ধি, আগের থেকে একটু আলাদা লাগছে ঐশীকে, সেই জৌলসের মাত্রা কিছুটা হলেও কমেছে। গালে গোলাপী আভার লেশমাত্র নেই। চোখগুলো একটু কোটরের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
সামনে গিয়ে ঋদ্ধি মাথা নামিয়ে ফেলে। চোখের দিকে তাকাতে পারে না। মানুষ সাধারণত দুবার চোখে চোখ রাখার সাহস করতে পারে না প্রথমত, কিছু ভুল করলে আর দ্বিতীয়ত, কাছের মানুষের চোখে চোখ রেখে যদি আবেগতাড়িত হয়ে পরে। যদি মুষড়ে পরে। নিজেকে শক্ত করে ধরে রাখতে না পারে। যদি বিপরীত মানুষটা বুঝতে পেরে যায়, তাকে ছাড়া সে শূণ্য। অসম্পূর্ণ।
মাটির দিকে চোখ রেখেই ঋদ্ধি বলে, “বল। কি বলবি।”
“নীচের দিকে তাকিয়ে কেন? আমার দিকে তাকাতে কি সমস্যা?”এটুকু বলতে গিয়ে যেন গলা স্তব্ধ হয়ে আসে। ঐশীর কথা কেঁপে যায়। আর কিছু বলে উঠতে পারে না।
মুখ তুলে তাকায় ঋদ্ধি।
চোখ থেকে গালের ওপর গড়িয়ে পড়ছে এক একটা জলের ফোঁটা। আলোর উপস্থিতিতে হীরের মতো চকচক করছে সেগুলো।
আর থেমে থাকতে পারে না ঐশী, এই বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আগে আছড়ে পড়ে ঋদ্ধির বুকের ওপর। দুহাতে নিজের বুকের সাথে আগলে নেয় ঐশীকে। ধীরে ধীরে পাঞ্জাবির ভিজে যায় । জমাট অন্ধকারের পরিধি ক্রমেই বাড়তে থাকে।
ভিজুক। কিছু বলে না ঋদ্ধি। সব বুঝিয়ে দিয়েছে ও।শুধু আরো চেপে ধরে ঐশীকে। হয়তো এই ভেবে, যাতে সেই বাঁধন ছেড়ে আর পালাতে না পারে কোনোদিন।

ভালোবাসা আর নদী আসলে সমান্তরাল। তার গভীরতা পাড়ে দাঁড়িয়ে অনুমান করা কখনই সহজ নয়। যতক্ষণ না আমরা তাতে ডুব দিই। ভালোবাসা আর নদী যত গভীর হয় তত আমাদের টেনে নিয়ে যায় তার অতলে। হারিয়ে যাই একসময়। তাই কখনো কখনো ভাসতে হয় আবার কখনো তার গভীর তলদেশের মাটি ছুঁয়ে নিতে হয়।

বুধবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২১

তুমি

 তুমি আমি কয়েক বছর পরে,

নতুন করে মন কেমনের পরে। 

রাগ করার সাধ্যি কোথায় পাবো? 


একলা হওয়ার মিথ্যে কথাগুলো, 

লজ্জা দিলে চুপটি করেই ভুলো।  

আবার ঠিক আগলে তোমায় নেবো! 


চোখ বুজিয়ে দেখতে চাওয়ার ছলে,

চোখের কোনের কাজল মেশা জলে,

তোমায় আবার আলতো করে ছোঁবো।

- শাহজাহান🌿


Bangla Golpo || Jodi Jete Chao || Shahjahan

  বাসের জানলার ধারে বসে একমনে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে ঐশী। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে, আর তার ছোটো ছোটো ছাঁট এসে পড়ছে ওর চোখে-মুখে। সেই কারণে অ...